Recents in Beach

আদাব সমরেশ বসু সহায়িকা বিষয়সংক্ষেপ প্রশ্ন ও উত্তর

আদাব 

সমরেশ বসু 

বিষয়সংক্ষেপ

প্রাকস্বাধীনতালগ্নে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সমগ্র ভারতে যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, তার জোয়ার এসে পড়েছিল কলকাতায়। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার প্রেক্ষাপটেই কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসু লিখেছিলেন ‘আদাব’ গল্পটি, যা ছিল চিরন্তন মানবিকতায় ভরপুর। বাংলাদেশের প্রধান । জারি হয়েছে শহরে দাঙ্গা বেঁধেছে হিন্দু আর মুসলমানে ১৪৪ ধারা আর কারফিউ। চারিদিকে গুপ্তঘাতক আর লুঠেরারা রয়েছে ওঁত পেতে। জ্বলছে আগুন। চারিদিকে মৃত্যুর বিভীষিকা। সৈন্যদের দাপাদাপি, গােলাগুলি। এমন অবস্থায় দুটো গলির মাঝখানে একটি ডাস্টবিনকে ঘিরে। লুকিয়ে থাকে দুটি মানুষ। দুজনেই ভাবে—কে হিন্দু, কে মুসলমান। একসময় সন্দেহ আর অস্বস্তি দূর হয়। জানা যায়, বুড়িগঙ্গার পারে সুবইডায় যার বাড়ি, সে নায়ের মাঝি, মুসলমান। অন্যজন নারায়ণগঞ্জের কাছে চাষাড়ার অধিবাসী, সুতাে কলের কর্মী, সে হিন্দু।

    হঠাৎ শােরগােল ওঠে। উচ্চকণ্ঠ হয় দুজনে। সুতােমজুর মাঝিকে বারবার বলে অন্যত্র চলে যেতে। কিন্তু মাঝি যায় না। ভাবে, সুতােমজুরের কোনাে ফন্দি আছে। আবার মাঝি না-যাওয়ার জন্য সুতােমজুরও ভাবে, তার বুঝি কোনাে মতলব আছে। শুরু হয় ভুল বােঝাবুঝি। শেষ পর্যন্ত মিলিয়ে যায় শােরগােল।

উভয়েই বাড়ির কথা ভাবে। হাটবাজারের মানুষের ব্যস্ততা, হাসাহাসি, বাক্যালাপ আবার এরই মধ্যে কাটাকাটি, দাঙ্গা, রক্তপাত । মানুষের এই নির্মমতায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুজন।

    কিছুক্ষণ পর বিড়ি খাওয়ার একটা মুহূর্ত আসে। ভিজে দেশলাই হওয়া সত্ত্বেও মাঝি সেটা জ্বেলে ফেলে। চমকে ওঠে সুতােমজুর। জানা যায় কার ধর্ম কী ! মাঝির সঙ্গে আছে। ইদের পরব উপলক্ষ্যে ছেলে-মেয়ে ও বউয়ের জন্য কিছু পােশাক। সুতােমজুর তার কাছে আর-একটি পুঁটলি দেখে জিজ্ঞেস করে, তাতে সন্দেহজনক আর কিছু আছে কি না। মাঝি সবই দেখিয়ে দেয়। সুতােমজুরও দেখিয়ে দেয়, তার কাছে একটা উঁচও নেই।

    দাঙ্গার জন্য তারা দেশের কর্তাব্যক্তিদের সমালােচনা করে। দাঙ্গায় রাজনৈতিক নেতাদের কোনাে ক্ষতি নেই, যত ক্ষতি তাদের। গত বছরের দাঙ্গায় যেমন সুতােমজুরের ভগ্নীপতি খুন হয় আর তার বিধবা বােন ও ছেলেমেয়েরা তার বাড়িতে ওঠে। অন্যদিকে মাঝির নৌকাও বাদামতলির ঘাটে ডুবিয়ে দেয় দাঙ্গাপ্রিয় মানুষ। ফলে বাঁধা খদ্দের রূপবাবুর কাছে সে যা পয়সাকড়ি পেত, তা আর পায় না। এমনকি হিন্দুরাও আসে না তার নৌকায়। হঠাৎ ভারী বুটের শব্দ শােনা যায়। দুজনে ছুটে গিয়ে। পৌঁছোয় পাটুয়াটুলি রােডে। সেখান থেকে যায় পশ্চিমে। লুকিয়ে পড়ে মেথর যাতায়াতের গলিতে। উঁকি মারে এদিক-ওদিক। এক জায়গায় দেখা যায়, একদল পুলিশ, সেটা ইসলামপুর ফাঁড়ি। তার বাঁ-দিকের গলি ধরে গেলে বাদামতলির ঘাট। আটদিন বাড়ি ছাড়া, তাই মাঝি যেতে চায় সেদিকে। সুতােমজুরের সেদিকে যাওয়ার দরকার নেই। শেষ পর্যন্ত সুতােমজুরকে আদাব জানিয়ে মাঝি চলে যায়। সুতােমজুর তার মঙ্গল কামনা করে। সে মৃদু হাসে এই ভেবে যে, কতদিন পর মাঝির ছেলেমেয়েরা তাকে পেয়ে

নামকরণ

সাহিত্যে নামকরণ হল এমন একটি বিষয়, যার মধ্য দিয়ে পাঠকমন সাহিত্যের গভীরতা আস্বাদনে আগ্রান্বিত হয়ে পড়ে। বিষয়ের রসবােধের প্রাথমিক স্বাদই দেয় নামকরণ। সাহিত্যে নামকরণ কখনও বিষয়মুখী, কখনও হয় ব্যঞ্জনাধর্মী, কখনও বা উপমাবাচক হয়ে থাকে।

    প্রাকস্বাধীনতালগ্নে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সমগ্র ভারতে যে রক্তক্ষয়ী দাঙা শুরু হয়েছিল, তার জোয়ার এসে পড়েছিল কলকাতা শহরের বুকে । সাহিত্যিক সমরেশ বসু আলােচ্য ‘আদাব’ গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে তুলে ধরেছেন সেই দাঙ্গার পরিবেশকে। গল্পে ফুটে উঠেছে। দাঙ্গার সেই মর্মান্তিক ভয়াবহ রূপ। আদাব’ কথাটি হল মুসলমান সম্প্রদায়ের অভিবাদন রীতি। ‘আদাব’ কথার অর্থ ‘সেলাম। কিন্তু পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় একটা ভাব লুকিয়ে আছে এই শব্দে। মুসলমান নায়ের মাঝি আর হিন্দু সুতােমজুরের দেখা হয় একটি শহরে, একটি ডাস্টবিনকে ঘিরে, যেখানে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জারি হয়েছে কারফিউ আর ১৪৪ ধারা। পরস্পরের প্রতি তাদের সন্দেহ জাগে। কে, কার হাতে খুন হতে পারে তাই তারা ভাবে।  কিন্তু না, সম্প্রদায় যাই হােক, দুজনেই শ্রমজীবী, দুজনেই দারিদ্র্যের শিকার। তাদের দুঃখ-দুর্দশা ভুলিয়ে দেয় তাদের সাম্প্রদায়িক হিংসা। পরস্পর হয়ে ওঠে সহমর্মী, সহানুভূতিশীল। দুজন দুজনের অন্তরের কথা শুনতে পায়। নিজেদেরকে বাঁচানাের কথা ভাবে। তারা দেখেছে সাম্প্রদায়িকতায় তাদের কী ক্ষতি হয়েছে। এবং কারা সেই ক্ষতি করেছে। মাঝি হারিয়েছে নৌকা, সুতােমজুর হারিয়েছে তার ভগ্নীপতিকে। কিন্তু নিরুপায় তারা। প্রাণে বাঁচার জন্য তারা ঘােরে শহরের গলিখুঁজি। মুক্তি নেই। মুক্তির জন্য মাঝি ছুটে যায় বাদামতলির ঘাটের দিকে। সুতােমজুর শুনতে পায় গুলির শব্দ আর দেখতে পায় মাঝির রক্তে রঞ্জিত পােশাক। মাঝি যে আদাব জানিয়ে সুতােমজুরের কাছ থেকে ছুটে যাচ্ছিল ঘাটের দিকে, সেই আদাব-ই হয়ে উঠল চিরতরের বিদায় সম্ভাষণ। যা মর্মান্তিক মৃত্যুর ইঙ্গিতবহ, এটাই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারায় মানবিকতা যে ভুলুণ্ঠিত হয় সেটাই আলােচ্য গল্পে দেখা যায়। গল্পের শেষে যে বিয়ােগান্তক পরিণতি ঘটবে, ‘আদাব’ নামকরণের মধ্য দিয়েই পাঠকরা তার আভাস পায়। এই কারণেই ‘আদাব’ নামকরণটি ব্যঞ্জনাধর্মী এবং যথাযথ হয়েছে। 

হাতে কলমে

১.১ সমরেশ বসুর ছদ্মনাম কী ?

উঃ সমরেশ বসুর ছদ্মনাম হল ‘কালকূট’। এ ছাড়াও তাঁর অন্য একটি ছদ্মনাম হল ‘ভ্রমর।

১.২ তাঁর লেখা দুটি উপন্যাসের নাম লেখাে। 

উঃ তাঁর লেখা দুটি উপন্যাসের নাম হল- ‘গঙ্গা ও ‘বিবর’।

২ নীচের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর একটি বাক্যে লেখাে :

২.১ কোন্ সময়পর্বের কথা গল্পে রয়েছে ?

উঃ ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের সময়পর্বের দাঙ্গা বিধ্বস্ত বাংলার কথা গল্পে রয়েছে।

২.২ ‘ডাস্টবিনের দুই পাশে দুটি প্রাণী’—প্রাণী দুটির পরিচয় দাও।

উঃ
ডাস্টবিনের দুই পাশের একজন মুসলমান সে নায়ের মাঝি এবং অন্যজন হিন্দু, সে সুতাে কলের কর্মী।

২.৩ ওইটার মধ্যে কী আছে ?-বা কীসের প্রতি ইঙ্গিত করে ?

উঃ বক্তা মাঝির বগলে থাকা পুঁটলিটির প্রতি ইঙ্গিত করে। 

২.৪ গল্পে কোন্ নদীর প্রসঙ্গ রয়েছে ?

উঃ
গল্পে বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গা নদীর প্রসঙ্গ রয়েছে।

২.৫ ‘সুতা-মজুরের ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে উঠল...'—তার এই হাসির কারণ কী ?

উঃ নায়ের মাঝির সঙ্গে তার বিবিজানের সাক্ষাৎলাভের সম্ভাব্য একটি কথা কল্পনা করে সুতামজুরের ঠোটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছিল।

৩ নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখাে :

৩.১ শহরে ১৪৪ ধারা আর কারফিউ অর্ডার জারি হয়েছে।’-লেখকের অনুসরণে গল্পঘটনার রাতের দৃশ্য বর্ণনা করাে।

উঃ ‘আদাব’ গল্পের শুরুতেই দাঙ্গা-আতঙ্কিত বাংলার ভয়াবহ রূপ উঠে এসেছে। নিস্তব্ধ অন্ধকার রাত। চারিদিকে গুপ্তঘাতকের দল। সবসময় ছুটে চলেছে। মিলিটারি গাড়ি। তাতে কেঁপে উঠছে চারিদিকের নিস্তব্ধতা। তার মধ্যে একটা গাড়ি পাক খেয়ে যায় ভিক্টারিয়া পার্কের পাশ দিয়ে। আর এমনই অন্ধকার রাত, যে রাতে বেড়ে উঠেছে চোরাগােপ্তাদের পৈশাচিক উল্লাস। হিংসায় উন্মত্ত মানুষগুলি দা, সড়কি, লাঠি, ছুরি নিয়ে পরস্পরকে হত্যা করতে ছুটোছুটি করছে। যেন এক নারকীয় পরিস্থিতি। অবাধে লুঠতরাজ চলছে। নরপশুদের বিকৃত উল্লাসে রাত্রি ফেটে পড়ছে। বস্তিতে আগুন লাগানাে হচ্ছে, কানে ভেসে আসছে অসহায় নরনারীর আর্তনাদ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গুলি চালাচ্ছে।

৩.২ হঠাৎ ডাস্টবিনটা একটু নড়ে উঠল।‘ডাস্টবিন নড়ে ওঠার অব্যবহিত পরে কী দেখা গেল ?

উঃ
ডাস্টবিনটি নড়ে ওঠার অব্যবহিত পরে দেখা গেল, ডাস্টবিনের দু-পাশে দুটি মানুষ, নিস্পন্দ, নিশ্চল তাদের বুকের স্পন্দন যেন তালহারা ধীর। চারটি চোখে ফুটে উঠেছে ভয়-সন্দেহ আর উত্তেজনা। পরস্পরের প্রতি তাদের কোনাে বিশ্বাস নেই। দুজনে দুজনকে ভাবছে। খুনি। অচিরেই যেন তারা পরস্পরকে আক্রমণ করে।

৩.৩ হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির আবহ গল্পে কীভাবে রচিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করাে। 

উঃ আদাব’ গল্পে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে-সম্প্রীতির আবহ পরিবেশ রচিত হয়েছে, তা বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতাে। যেমন—ডাস্টবিনের ধারে সদ্য পরিচিত দুই ভিন্নধর্মী মানুষ একসঙ্গে বিড়ি খায়, সুখ-দুঃখের কথা বলে। বিশেষ করে দাঙ্গার ফলে মুসলমান নায়ের মাঝি বলে, তার নৌকো হারানাের কথা আর সুতােমজুর জানায়, তার বােনের বিধবা হওয়ার কথা। তারা বুঝতে পারে না, মানুষ এত নির্মম হয় কী করে। এইভাবে তারা শহরের গলিখুঁজিতে লুকোয়। পরস্পরকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। সুতােমজুর মাঝির পরিবারের কথা ভাবে আবার তার মৃত্যুতে বেদনাহতও হয়ে ওঠে। এমনকি মাঝির ‘ভাই’ সম্ভাষণও বুঝিয়ে দেয় গল্পে। তাদের পারস্পরিক নির্ভরতা ।

৩.৪ মুহূর্তগুলিও কাটে যেন মৃত্যুর প্রতীক্ষার মতাে। —সেই রুদ্ধ উত্তেজনাকর মুহূর্তগুলির ছবি গল্পে কীভাবে ধরা পড়েছে তা দৃষ্টান্ত-সহ আলােচনা করাে।

উঃ শহরে দাঙ্গা বেঁধেছে হিন্দু-মুসলমানে। কখনও শােরগােল, কখনও নিশ্রুপ মৃত্যুতে যেমন মানুষের শরীর স্তব্ধ হয়ে আসে, তেমনই স্তব্ধতা চারিদিকে। নায়ের মাঝি আর সুতােমজুর জানে না, কার দিকে থেকে কখন মৃত্যু ঘনিয়ে আসতে পারে। ডাস্টবিনকে ঘিরে দুটি মানুষ ভাবে নিজেদের বিপদের কথা, ঘরের কথা, ছেলেমেয়েদের কথা । । কিন্তু তারা কি প্রাণে বেঁচে বাড়ি ফিরবে? কথা নেই, বার্তা, নেই, হঠাৎ বজ্রপাতের মতাে কোথা থেকে নেমে আসে দাঙ্গা। মানুষের মধ্যে হাটে-বাজারে এই হাসাহাসি, বাক্যালাপ আর মুহূর্তেই খুনখারাপি এমনই রুদ্ধ উত্তেজনাকর মুহূর্ত এ গল্পে ধরা পড়েছে।

৩.৫ এমনভাবে মানুষ নির্মম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে কী করে? —উদ্ধৃতিটির আলােকে সেই সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি আলােচনা করাে।

উঃ
‘আদাব’ গল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে লেখক ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গকে ইঙ্গিত করেছেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট, ব্রিটিশ রাজের অবসানের পর ভারত দ্বি-খণ্ডিত স্বাধীনতা পায়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বীজ ভারতবর্ষকে—ভারতবর্ষ, পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানে বিভক্ত করে। ব্রিটিশ সরকার এই দেশের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভাজন তৈরি করেছিল, তার পরিণতি ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।   শহরে তখন ১৪৪ ধারা আর কারফিউ জারি হয়েছে, যার ফলে দলবদ্ধভাবে কোথাও ঘােরাঘুরি করা যাবে না কিংবা নির্দিষ্ট সময় ছাড়া বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরােনাে যাবে না। সবসময় চলছে মিলিটারি টহল । কিন্তু তার মধ্যেই কোনাে জায়গা থেকে ভেসে আসছে। গােলাগুলির শব্দ, শােরগােল। কারণ, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা বেধেছে। যে যাকে পারে হত্যা করছে। গুপ্তঘাতকের দল ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। সুযােগ পেলেই তারা পরস্পরকে হত্যা করতে উদ্যত। অথচ হাটেবাজারে মানুষের মধ্যে কত হাসাহাসি, কথােপকথন আর তার পরেই সবাই মেতে ওঠে এমন নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে।

৪ নিম্নলিখিত বাক্যগুলির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করাে :

৪.১ রাত্রির নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিটারি টহলদার গাড়িটা একবার ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে একটা পাক খেয়ে গেল।

উৎস:  উদ্ধৃতাংশটি সমরেশ বসুর লেখা ‘আদাব’ গল্প থেকে গৃহীত।

তাৎপর্য: এখানে লেখক ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়ের কথা বলেছেন। সালটা ১৯৪৬। বাংলাদেশের প্রধান শহরে তখন দাঙ্গা বেঁধেছে হিন্দু-মুসলমানে। সেই দাঙ্গা ঠেকাতে রাতের শহরে ছুটে চলেছে মিলিটারি টহলদার গাড়ি। যার শব্দে কেঁপে উঠছে। রাত্রির নিস্তব্ধতা। এমনই একটি গাড়িকে দেখা গেল ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে পাক খেতে এই কথাটিই লেখক উক্ত পঙক্তিটির মাধ্যমে বলেছেন। 

৪.২ ডাস্টবিনের দুই পাশে দুটি প্রাণী, নিস্পন্দ নিশ্চল।

উৎস: উদ্ধৃতাংশটি সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্প থেকে গৃহীত।

তাৎপর্য: লেখক ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে দাঙ্গাবিধ্বস্ত একটি শহরের ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন আলােচ্য পঙক্তির মাধ্যমে। এখানে ডাস্টবিনের পাশে যে দুটি নিস্পন্দ, নিশ্চল প্রাণীর কথা বলা হয়েছে, তারা আসলে একজন হিন্দু সুতােমজুর আর অন্যজন মুসলমান নায়ের মাঝি। উভয়ের দৃষ্টি ভয়-সন্দেহ আর উত্তেজনায় তীব্র হয়ে উঠেছে বলে তাদের এরকম অবস্থা।

৪.৩ থানকাল ভুলে রাগে-দুঃখে মাঝি প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে

উৎস: উদ্ধৃতাংশটি সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্প থেকে গৃহীত।

তাৎপর্য: একজন হিন্দু ও একজন মুসলমান উভয়েই প্রাণভয়ে ভীত হয়ে একটি গলির সামনে পড়ে থাকা ডাস্টবিনের পাশে আশ্রয় নেয়। তখন কাছাকাছি শােরগােল শুনতে পেয়ে তারা সেখান থেকে পালানাের পথ খোঁজার চেষ্টা করে। সেই কথাই এখানে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অবস্থা ভালাে নয় দেখে সুতােমজুর, নায়ের মাঝিকে পালিয়ে যেতে নিষেধ করে। মাঝি ভাবে, সুতােমজুরের হয়তাে কোনাে বদ অভিপ্রায় আছে এবং এরকম কিছুক্ষণ চলতে থাকার পর সুতােমজুর নায়ের মাঝিকে জিজ্ঞেস করে, সে কোন জাতির লােক সে জানে না। শেষে যদি তাকে মারার জন্য তাদের দলবল নিয়ে আসে? এরকম কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে মাঝি তখনই স্থানকাল ভুলে রাগে-দুঃখে চেঁচিয়ে ওঠে।

৪.৪ ‘অন্ধকারের মধ্যে দু-জোড়া চোখ অবিশ্বাসে উত্তেজনায় আবার বড়াে বড়াে হয়ে উঠল।

উৎস:  সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্প থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত হয়েছে।

তাৎপর্য: দাঙ্গাবিধ্বস্ত একটি শহরে দুটি গলির মধ্যিখানে অবস্থিত একটি ডাস্টবিনকে ঘিরে একজন মুসলমান নায়ের মাঝি এবং অন্যজন হিন্দু সুতােমজুর গােপনে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তারা কেউই একে অপরের পরিচয় জানে না। অবশেষে সুতােমজুর নায়ের মাঝিকে একটি বিড়ি খেতে দেয়। তার জন্য চাই আগুন। কিন্তু ভিজে দেশলাইকাঠি জ্বলতে চায় না। একসময় মাঝি সুতােমজুরের হাত থেকে দেশলাইটি প্রায় ছিনিয়ে নিয়েই জ্বেলে ফেলে আর প্রকাশিত হয় তার আসল পরিচয়। চমকে ওঠে সুতােমজুর। কাঠি নিভে যায় বাতাসে। ঠিক সেই সময় অন্ধকারের মধ্যে দু-জোড়া চোখ অবিশ্বাসে উত্তেজনায় বড়াে হয়ে ওঠে।-সমরেশ বসু এভাবেই ‘আদাব’ গল্পে ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়কে তুলে ধরেছেন।

৪.৫ ‘সুলতামজুরের বুকের মধ্যে টনটন করে ওঠে।

উৎস: ‘সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্প থেকে আলােচ্য উদ্ধৃতিটি গৃহীত হয়েছে।

তাৎপর্য:  নায়ের মাঝি আর সুতােমজুর দাঙ্গাবিধ্বস্ত একটি শহর থেকে বাড়ির দিকে পা বাড়ানাের চেষ্টা করে। কিন্তু নানা প্রতিকূল অবস্থা তাদের বাধা দেয়। তবে বাদামতলির ঘাটের সন্ধান পেয়ে মাঝি সেদিকে যাবে বলে স্থির করে। সুতােমজুর বিপদের আশঙ্কায় তার কামিজ চেপে ধরে। কিন্তু তবুও মাঝি চলে যেতে চায়। সুতােমজুরকে সে খুব কাকুতিমিনতি করেই জানায়, তাকে যেন সে ছেড়ে দেয়। কাল ইদ ছেলে-মেয়েরা নতুন জামা পরবে। বাপজানের কোলে চড়বে। এরকম একটা দৃশ্যের কল্পনা করে মাঝি, সুতােমজুরের কথা রাখতে পারে না। তার গলার স্বরে বিষন্নতা নেমে আসে। ঠিক এরকম একটি মুহূর্তে সুতােমজুরের বুক টনটন করে ওঠে।

৪.৬‘ভুলুম না ভাই এই রাত্রের কথা।

উৎস: ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে লেখা সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্প থেকে এই পঙক্তিটি উদ্ধৃত। x

তাৎপর্য: এখানে হিন্দু সুতােমজুর আর মুসলমান নায়ের মাঝি দাঙ্গাবিধ্বস্ত একটি শহরে একটি ডাস্টবিনের আড়ালে আশ্রয় নেয়। কারণ, কোনাে মানুষ ১৪৪ ধারা আর কারফিউ জারি থাকার ফলে দলবদ্ধভাবে প্রকাশ্যে সন্ধেবেলায় বেরােতে পারছে না। কিন্তু গল্পে উল্লিখিত দুটি মানুষ আলাদা সম্প্রদায়ের হলেও তারা দুজনেই শ্রমজীবী এবং উভয়ই দুঃখ-দারিদ্র্যের শিকার। দাঙ্গার শিকার। তাই তারা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরস্পরের সহমর্মী। সেজন্য মৃত্যু বিভীষিকাময় শহরের মধ্যে থেকে মাঝি, সাত-আট দিন পর নিজের বাড়ি যেতে চায়। কিন্তু সুতােমজুর তার বিপদের কথা ভেবে বারবার বাধা দেয়। তার এই ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে মাঝি তাকে জানায়, সে এই রাত্রের কথা ভুলবে না ।

৫ নীচের বাক্যগুলি থেকে অব্যয় পদ খুঁজে নিয়ে কোটি কোন্ শ্রেণির অব্যয় তা নির্দেশ করাে :

৫.১ শহরে ১৪৪ ধারা আর কারফিউ অর্ডার জারি হয়েছে। 

উঃ আর = সংযােজক অব্যয়।

৫.২ তারা গুলি ছুঁড়ছে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে।

উঃ ও
= সংযােজক অব্যয়।

৫.৩ তে উভয়েই একটা আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে থাকে, কিন্তু খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনাে পক্ষ থেকেই আক্রমণ এল না।

উঃ কিন্তু = সংকোচক অব্যয়।

৫.৪ তােমার মতলবটা তাে ভালাে মনে হইতেছে না। 

উঃ তো = আলংকারিক অব্যয়।

৫.৫ মাঝি এমনভাবে কথা বলে যেন সে তার কোনাে আত্মীয়বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে। 

উঃ যেন = সংশয়াত্মক বা সমুচ্চয়ী অব্যয়।

৬ নীচের বাক্যগুলি থেকে সন্ধিবদ্ধ পদ খুঁজে নিয়ে তাদের সন্ধি বিচ্ছেদ করাে :

৬.১ তা ছাড়া চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে গুপ্তঘাতকের দল।

উঃ চতুর্দিকে = চতুঃ + দিকে ।

৬.২ মৃত্যু-বিভীষিকাময় এই অন্ধকার রাত্রি তাদের উল্লাসকে তীব্রতর করে তুলেছে।

উঃ
উল্লাস = উৎ + লাস। 

৬.৩ নির্জীবের মতাে পড়ে রইল খানিকক্ষণ। 

উঃ নির্জীব = নিঃ  + জীব।

৬.৪ দাঁতে দাঁত চেপে হাত-পাগুলােকে কঠিন করে লােকটা প্রতীক্ষা করে রইল একটা ভীষণ কিছুর জন্য। 

উঃ প্রতীক্ষা = প্রতি + ঈক্ষা।

৬.৫ সমস্ত অঞলটার নৈশ নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে দুবার গড়ে উঠল অফিসারের আগ্নেয়াস্ত্র।

উঃ নিস্তব্ধতা = নিঃ + স্তব্ধতা ; আগ্নেয়াস্ত্র = আগ্নেয় + অস্ত্র।

৭ ব্যাসবাক্য-সহ সমাসের নাম লেখাে : চোরাগােপ্তা, পথনির্দেশ, নির্জীব, দীর্ঘনিশ্বাস, পােলামাইয়া।

➡️  চোরাগােপ্তা = যা চোরা তাই গােপ্তা ।(কর্মধারয় সমাস)

➡️  পথনির্দেশ = পথের নির্দেশ। (সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস)

➡️  নির্জীব = নয় জীব। (ন-তৎপুরুষ সমাস)

➡️  দীর্ঘনিশ্বাস = দীর্ঘ যে নিশ্বাস। (সাধারণ কর্মধারয় সমাস) 

➡️ পােলামাইয়া = পােলা ও মাইয়া। (দ্বন্দ্ব সমাস)

৮ নিম্নরেখাঙ্কিত অংশের কারক-বিভক্তি নিশে করাে :


৮.১ দু-দিক থেকে দুটো গলি এসে মিশেছে এ জায়গায়।

উঃ জায়গায় = অধিকরণ কারকে ‘য়’ বিভক্তি।

৮.২ সন্দেহের দোলায় তাদের মন দুলছে।

উঃ সন্দেহের
= সম্বন্ধপদে ‘এর’ বিভক্তি

৮.৩ নিষ্ফল ক্রোধে মাঝি দু-হাত দিয়ে হাঁটু দুটোকে জড়িয়ে ধরে।

উঃ ক্রোধে = করণ কারকে ‘এ’ বিভক্তি।

৮.৪ আমাগাে কথা ভাবে কেডা ?

উঃ আমাগাে = সম্বন্ধপদে ‘গাে’ বিভক্তি;  কেডা = কর্তৃ কারকে ‘শূন্য’ বিভক্তি।

৮.৫ মুহূর্তগুলি কাটে রুদ্ধ নিশ্বাসে।।

উঃ
রুদ্ধ নিশ্বাসে = করণ কারকে ‘এ’ বিভক্তি। >

৯ নীচের শব্দগুলিতে ধ্বনি পরিবর্তনের কোন্ কোন্ নিয়ম কাজ করেছে লেখাে : হেইপারে, নারাইনগঞ্জ, ডাইকা, আঙুল, চান্দ।

➡️  হেইপারে < সেইপারে (বর্ণবিকার)

➡️  নারাইনগঞ্জ < নারায়ণগঞ্জ (মধ্যস্বরলােপ, বর্ণবিকার) 

➡️  ডাইকা < ডাকিয়া (অপিনিহিতি) 

➡️  আঙুল < আঙ্গল < অঙ্গলি (বর্ণলােপ, বর্ণাগম) 

➡️  চান্দ < চন্দ্র (ধ্বনিলােপ, ধ্বন্যাগম)

১০ নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করাে :

১০.১ রাত্রির নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিটারি টহলদার গাড়িটা একবার ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে একটা পাক খেয়ে গেল। (জটি বাক্যে)

উঃ
রাত্রির নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে দিয়ে যে গাড়িটা একবার ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে একটা পাক খেয়ে গেল, সেটি গাড়িটা মিলিটারি টহলদার গাড়ি। 

১০.২, খানিকক্ষণ চুপচাপ। (না-সূচক বাক্যে)

উঃ
খানিকক্ষণ কোনাে শব্দ নেই।

১০.৩ পরিচয়কে স্বীকার করতে উভয়েই নারাজ।(প্রশ্নবােধক বাক্যে) 

উঃ পরিচয়কে স্বীকার করতে উভয়ের কেউ কি রাজি আছে? 

১০.৪ শােরগােলটা মিলিয়ে গেল দূরে। (যৌগিক বাক্যে) 

উঃ শােরগােলটা হল কিন্তু দূরে মিলিয়ে গেনন।

১০.৫ মাঝি বলল, চল যেদিক হউক। (পরােক্ষ উক্তিতে)

উঃ মাঝি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে যেদিকে খুশি যাওয়ার জন্য বলল।

১১ ক্রিয়ার কাল নির্দেশ করাে :

১১.১ কান পেতে রইল দূরের অপরিস্ফুট কলরবের দিকে

উঃ
সাধারণ অতীত কাল। 

১১.২ সন্দেহের দোলায় তাদের মন দুলছে।

উঃ
  ঘটমান বর্তমান কাল। 

১১.৩ ধারে-কাছেই য্যান লাগছে ।

উঃ পুরাঘটিত বর্তমান কাল। 

১১.৪ অশান্ত চঞ্চল ঘােড়া কেবলি পা ঠুকছে মাটিতে।

উঃ ঘটমান বর্তমান কাল।

১১.৫ বাদামতলির ঘাটে কোন অতলে ডুবাইয়া দিছে তারে-

উঃ পুরাঘটিত বর্তমান কাল।

১২ নীচের শব্দগুলির শ্রেণিবিভাগ করাে : মজুর, লীগওয়ালাে, পুলিশ, নসিব, রাত্রি।

➡️ মজুর = বিশেষ্য (ফারসি শব্দ)। 

➡️ লীগওয়ালাে = বিশেষ্য (প্রত্যয়ঘটিত মিশ্র শব্দ)

➡️ পুলিশ = বিশেষ্য (ইংরেজি শব্দ)

➡️ নসিব = বিশেষ্য (আরবি শব্দ)

➡️ রাত্রি = বিশেষ্য (তৎসম শব্দ)

 


Post a Comment

0 Comments